ঢাকাশনিবার , ১৬ই অক্টোবর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ
  1. অর্থনীতি
  2. আবহাওয়া
  3. আর্ন্তজাতিক
  4. ইসলামী জীবন
  5. করোনা আপডেট
  6. খেলাধুলা
  7. চাকরি-বাকরি
  8. জাতীয়
  9. দূর্ঘটনা
  10. নাগরিক সংবাদ
  11. পাঁচমিশালি
  12. প্রচ্ছেদ
  13. বরিশাল বিভাগ
  14. বাংলাদেশ
  15. বিনোদন
আজকের সর্বশেষ সবখবর

পাঠপ্রতিক্রিয়া: অদ্ভুত এক জাদুকরের ‘একটা জাদুর হাড়’

admin
জুলাই ৭, ২০২০ ১:২৮ অপরাহ্ণ
Link Copied!

  • এ কে শেরাম

    জফির সেতু এক শক্তিমান কবি। সৃজনকলায় তাঁর, আরও অন্য কিছু পরিচয়ের পরও, আমি মনে করি, কবি পরিচিতিটাই প্রধান। ‘একটা জাদুর হাড়’ জফির সেতুর সাম্প্রতিকতম উপন্যাসগ্রন্থ। ২০২০ এর বইমেলা উপলক্ষে এটি প্রকাশ করেছে ‘নাগরী’। এই উপন্যাসগ্রন্থেও আমরা, সাধারণ পাঠকেরা, কবি জফির সেতুকেই যেন আবিষ্কার করি। গ্রন্থের একেবারে প্রথম থেকেই প্রতিটি পঙক্তি, পৃষ্ঠা, অধ্যায় জুড়ে এক অদ্ভুত ধ্বনি ও ছন্দের দোলা আমরা অনুভব করি। শব্দচয়ন ও বাক্যবিন্যাস, বর্ণনাশৈলী ও কাহিনিনির্মাণে এক অন্তর্গত ছন্দের খেলা যেন পাঠকহৃদয়কে ক্রমাগত আন্দোলিত করে চলে। লেখক, এক অদ্ভুত জাদুকরের মতো, ‘একটা জাদুর হাড়’ দোলাতে দোলাতে পাঠককে সম্মোহিত করে টেনে নিয়ে চলেন কাহিনির শেষ-অব্দি।

    কাহিনির শুরু এভাবে- ‘প্রেমে পড়ার জন্য বয়সটা ছিল দারুণ। আমার তেইশ, আর ওর ছিল সতেরো। সুতরাং আমরা প্রেমে পড়লাম।‘ কাহিনির মূল চরিত্র, এই আমিটা, বিজয়; এক আত্মমগ্ন তরুণ যুবক; কখনো কখনো কিছুটা খামখেয়ালীও। আর প্রেমিকা মেয়েটি মিথুন। ধনীর দুলালী, সপ্রতিভ, টগবগে ও মেধাবী। মিথুনের দিক থেকেই প্রথম চিঠিটা আসে। নীল খামে লেখা চিঠি। চিঠি পেয়ে যুবক বিজয়ের অনুভূতির প্রকাশটা এরকম- ‘ .. বাইরে ছিল গান, আমার ভেতরেও। সময়টা শীতের শুরু। সামনে কম্পমান বসন্ত। চিঠিখানা পেয়ে আমার বুক কাঁপল।’
    বিজয় গ্রামের ছেলে, ভাটি অঞ্চলের। দরিদ্র। কিন্তু মেধাবী। পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের কারণে বৃত্তি পেত। বৃত্তির টাকাতেই তার কলেজের পড়াশোনা চলত। সেই বৃত্তির টাকা নিয়মিত আসত পোস্টঅফিসের মাধ্যমে। তারই খোঁজ নিতে গিয়ে পোস্টঅফিসে পায় প্রথম প্রেমপত্র। সেই শুরু। তারপর প্রেম এগিয়ে চলে।

    প্রথম দেখা হওয়ার দিনেই মিথুন ও বিজয় প্রায় পুরোটা দিন কাটিয়ে দেয় পাহাড়ের গহীনে, বৃক্ষলতার নিঃসীম নৈঃশব্দ্যে। এক অদ্ভুত ভালোলাগায় আবিষ্ট হয় দুজন। তারপর সময় গড়িয়ে চলে, আরও চিঠি বিনিময় হয় দুজনের, দেখা হয়। আরেকদিন বিজয় আর মিথুন একসাথে বেরোয়। নদীতে নৌকো চড়ে বেড়ায়। টিলার ওপর গাছের ছায়ায় বসে। একসময় বিজয় মিথুনকে বলে, তোমার একটা স্মৃতি দাও। কী দেবো, কিছুই তো আনিনি, ঝটপট উত্তর মিথুনের। কিন্তু বিজয় নাছোড়বান্দা, যা আছে তা’ই দাও। ভেতরে যেটা পরেছ, সেটাই। চমকে ওঠে মিথুন, প্যান্টি? বিজয়ের একগুঁয়েমির কাছে হার মানে মিথুন। গাছের আড়ালে গিয়ে খসখস করে খুলে ফেলে হলদে অন্তর্বাস। তারপর তুলে দেয় বিজয়ের হাতে। বিজয় জাপটে ধরে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নেয়। কিন্তু একসময় দুজনের সম্পর্কে ক্লান্তি নামে। মিথুন এক ভয়াবহ অসুখকে গোপনে পুষে রাখে শরীরে, বিজয়কে জানতে দেয় না। মিথুনের আচরণে বিজয় বিরক্ত হয়, মন উঠে যায় মিথুনের ওপর থেকে। তারপর একদিন এক বিপণিবিতানের কোণে দাঁড়িয়ে তাদের শেষ দেখা হয়, উপহার বিনিময় হয়। তার কিছুদিন পর ব্রিটিশ সরকারের স্কলারশিপ পেয়ে যুক্তরাজ্যে চলে আসে বিজয়। এরপর আর কোনো যোগাযোগ নেই মিথুন ও বিজয়ের।

    তার ঠিক চুয়ান্ন বছর পর বিজয় ও মিথুনের প্রায় নিস্তরঙ্গ জীবনে আবার আসে কেমন এক উথালপাথাল ঢেউ। বিজয় ততদিনে কর্মজীবন থেকে অবসর নিয়ে এক নিরুপদ্রব জীবন কাটাচ্ছেন ইংল্যান্ডে। আর মিথুন তখন ঢাকায় এক হাসপাতালে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন। দৃশ্যপটে আবির্ভাব ঘটে সোনিয়ার, মিথুনের কন্যা, কর্মোপলক্ষে যিনি তখন লন্ডনেই থাকেন। একদিন সোনিয়া ফোনে নিজের পরিচয় দিয়ে বিজয়ের সাক্ষাৎপ্রার্থী হন। তারপর এক পার্কে দেখা হয় তাদের। সোনিয়া জানান, তার মা মিথুন মৃত্যুশয্যায়। বিজয়কে একবার দেশে যেতে হবে। তার মা তাকে দেখতে চান, হয়ত শেষ দেখা। বিজয় স্তব্ধ হন। সোনিয়ার কাছ থেকেই জানতে পারেন, তরুণী বয়সেই মিথুনের স্তনে ক্যান্সার ধরা পড়েছিল। অপারেশনও করা হয়েছিল। কিন্তু সেটা আবার ফিরে আসে। বিজয় কোনো জবাব দিতে পারেন না। ফিরে আসেন। কিন্তু পরদিনই সিদ্ধান্ত নেন, তিনি দেশে যাবেন, সোনিয়াকে দেখতে। ফোন করে সোনিয়াকে দেখা করতে বলেন। পরের রোববারেই তারা দেখা করেন লন্ডনের একটি পাবে। ঠিক হয়, বিজয় দেশে যাবেন। সোনিয়াও।

    দেশ ত্যাগের ঠিক চুয়ান্ন বছর পর বিজয় আবার ফিরে আসেন তার স্মৃতিময় শহরে, রহস্যের নগরে। তার বয়স এখন সাতাত্তর। কিন্তু তেইশের যুবকের মতোই তিনি বিকেলের ম্লান আলোয় হাঁটেন শহরের অলিতে-গলিতে, পির শাহজালালের মাজারের সামনে দিয়ে, সুরমা নামের নদীটির পাড় ঘেঁষে চাঁদনীঘাটের দিকে, ক্বিন ব্রিজ আর নাগরী চত্বর হয়ে, হাঁটেন ইতিহাসের ধূসর মলিন পথ বেয়ে। পরদিন সকালে ‘ভিজিটরস টাইমে’ বিজয় যান হাসপাতালে মিথুনকে দেখতে। সোনিয়া সেখানে অপেক্ষায় ছিলেন। সারা শরীর এপ্রোনে ঢাকা, মুখে মাস্ক। বিজয়কেও সেরকম পোশাক পড়তে হলো। কদিন ধরে অবস্থার অবনতি হওয়ায় মিথুনকে সিসিইউতে স্থানান্তর করা হয়েছে। শরীর শুকিয়ে কাঠ, অক্সিজেন-স্যালাইন চলছে। সোনিয়া ইশারায় তার মাকে দেখালেন। নাহলে চেনার উপায় ছিল না। সোনিয়া কাছে গিয়ে মাকে ডাকলেন, মা, মা, দ্যাখো কে এসেছেন? ধীরে ধীরে চোখ খুলে একবার সোনিয়ার দিকে এবং একবার বিজয়ের দিকে তাকালেন মিথুন। তারপর চোখ বন্ধ করলেন। মাথায় চুল নেই, চোখের ভ্রূতেও। বোঝা গেল না চিনতে পেরেছেন কি-না। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বিজয় কাছে গিয়ে মিথুনের হিম-হিম হাতটিকে দুহাতে নিলেন। আবেগে, ভালোবাসায়। তারপর গাঢ়স্বরে ডাকলেন, মিথুন, মিথুন, চিনতে পারছো, আমি। চোখ খুলে তাকালেন মিথুন। ঠোঁট দুটি কেঁপে উঠলো তার। একটু নীল হয়ে আছে ঠোঁটের রং। বিজয় জানে, মিথুন তাকে চিনতে পেরেছে। আগেও দেখেছে, মিথুনের শরীরে যখন আবেগ খেলে তখন তার ঠোঁটের রং হয়ে যায় নীল। কপালের রগগুলোও তার নীল হয়ে উঠছে। উঠতে চেষ্টা করেন, কিছু বলতেও চান মিথুন। কিন্ত পারেন না। চোখ বন্ধ করে ফেলেন আবার। বিজয় সহ্য করতে পারেন না। ছুটে বেরিয়ে আসেন সিসিইউ থেকে।

    বিজয় ফিরে এসেছেন তার গেস্ট হাউসের কক্ষে। আজই তিনি সন্ধ্যার ফ্লাইটে ফিরে যাবেন লন্ডনে। ফেরার কোনো তাড়া ছিল না, কিন্তু তিনি আর এখানে এক মুহূর্তও থাকতে চাইছেন না। রুমের দরোজা বন্ধ করে সবগুলো বাতি জ্বেলে দিয়ে বিজয় সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে দাঁড়ান আয়নার সামনে। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন। সেই পুরোনো ইচ্ছেটা আবার জেগে উঠলো প্রবল হয়ে। তিনি লিপ্ত হলেন হস্তমৈথুনে। কিন্তু, এই মুহূর্তে তিনি কাউকেই মনে করতে পারছেন না, মিথুন, নিজের স্ত্রী বা অন্য কেউ। কেবল দেখলেন সোনিয়ার গলায় একটি শিরা নীল হয়ে ফুটে উঠছে। আর তার দিকে তাকিয়ে আছে একটা সাদা ময়ুর। এক অস্ফুট গোঙানির মধ্য দিয়ে যখন সবকিছুর শেষ হলো তখনই টোকা পড়ল দরোজায়। দ্রুত কাপড় পরে খুলে দেখেন, সোনিয়া দাঁড়িয়ে। বিজয়ের হাতে একটি প্যাকেট দিয়ে সোনিয়া বলেন, মা নিজের হাতেই হয়তো আপনাকে দিতে চেয়েছিলেন এটি। তাই সাথেই রেখেছিলেন। প্যাকেটটি খুলে দেখেন বিজয়, একটি জীর্ণ অথচ উজ্জ্বল হাড়, জাদুর হাড়। বিজয় সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে দেখেন, তার ঠোঁটগুলির সাথে মিথুনের ঠোঁটের কোথাও মিল আছে। ওপরপাটি দাঁতের একটি দাঁতের সঙ্গেও। বিজয় এগিয়ে গিয়ে সোনিয়ার চিবুকটি ধরেন, তার নিচের ঠোঁটের চামড়া কি উঠছে? বিজয় সোনিয়ার দিকে তাকিয়ে গাঢ়স্বরে বলেন, তোমাকে একটি জিনিস দেবার ছিল, নেবে? সোনিয়া খুব স্বাভাবিক গলায় বলেন, নেব। মিথুন মৃত্যুশয্যায় জেনেও দীর্ঘদিন ধরে সযত্নে আগলে রাখা মিথুনের স্মৃতি তার হলদে অন্তর্বাসটি পকেটে করে নিয়ে এসেছিলেন বিজয়। পকেট থেকে তা বের করে এগিয়ে দেন সোনিয়ার দিকে। সোনিয়া তা গ্রহণ করেন। তার চোখ চিকচিক করে ওঠে। বিজয় সোনিয়াকে জড়িয়ে ধরেন। তার চুলে নাক ডুবিয়ে ঘ্রাণ নেন। আর এরই ফাঁকে সোনিয়ার অলক্ষ্যে জানালা দিয়ে দ্রুত ছুঁড়ে ফেলে দেন জাদুর হাড়টি।

    উপন্যাসের পুরোটা কাহিনি জুড়ে নানাভাবে নানা শরীরী সম্পর্ক, যৌনতা যেন প্রায়শই কথা বলে উঠেছে। চুম্বন, হস্তমৈথুন, অবৈধ সঙ্গম বা বেশ্যাগমনের কথা ঘটনাপ্রবাহের স্বাভাবিক সূত্র ধরেই চলে এসেছে বারবার। এসেছে গ্রামের এক মেয়ে ভানুর প্রসঙ্গ, যার সাথে, অনেকের মতো, বিজয়েরও শরীরী সম্পর্ক হয়েছে; এসেছে বারবনিতা চাঁদনির কথাও। সাধারণভাবে এটাকে খুব আরোপিত মনে হয়নি। কিন্তু, কখনও কখনও বর্ণনার বিস্তৃতি বা অনুপুঙ্খতা, অনভ্যস্ত পাঠকের মনে, কিছুটা হলেও অস্বস্তির জন্ম দিতে পারে।

    ‘একটা জাদুর হাড়’ আপাদমস্তক এক প্রেমের উপন্যাস। উপন্যাসের নায়ক বিজয়ের প্রথম প্রেম সেই বালক বয়সে, গ্রামে। গ্রামের পাশের নদীপথ বেয়ে বেদেরা এসেছে, তিনটি পরিবার। নদীর পাড়ে, নলখাগড়ার বনের পাশে তাঁবু গাড়ে তারা। বেদেরা বাজিকর হয়। তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাজি দেখায়, তাবিজ-কবচ বিক্রি করে, ফুঁ-মন্তর করে, নানা অসুখ-বিসুখ সারায়। গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে যায় বাজিকরেরা এসেছে।
    বিজয় বন্ধু হাবিবকে নিয়ে বেদেদের তাঁবু দেখতে গিয়ে দেখে বাতাসকে। বেদেদের মেয়ে, বয়স নয়-দশই হবে। মেয়েটি কালো, চোখদুটি আরও কালো। চুলগুলো রুক্ষ, হাওয়ায় উড়ছে। কথা বললে গালে টোল পড়ে। বিজয়ের মনে হয়, বাতাস সুন্দর, এমন মেয়ে সে জীবনে দেখেনি।
    পরদিন স্কুল পালিয়ে সে আবার একা আসে বাতাসের কাছে। পরিচয় হয় বাতাসের সাথে, আলাপ হয় একথা-সেকথা। বিজয় বাতাসকে বলে, সে বাজিকর হতে চায়। বিজয় শুনেছে, বাজিকর হতে হলে বাজিকরের মেয়ে বিয়ে করতে হয়। বিজয় বাতাসকে বিয়ে করতে প্রস্তুত। কিন্তু সেকথা মুখ ফুটে বলে না। বাতাসের মধ্যেও একধরনের ভালোলাগা বোধ সঞ্চারিত হয়। বাতাস বলে, তাহলে কাল এসো, এই সময়ে। পরদিন বিজয় এক অনিবার্য টানে ঠিকই আসে। বাতাস তাকে আদর করে ছাগলের দুধ খাওয়ায়। আর গোপনে হাতে গুঁজে দেয় একটা চিকন হাড়। বহুকালের পুরোনো দুধসাদা হাড়। বলে, জাদুর হাড়, বাবার থলে থেকে চুরি করেছি, যত্ন করে রেখো। তারপর, চলে যেতে বলে বিজয়কে। কারণ, তার বাপ কাজে যায়নি, এখনই ফিরে আসবে। তাই, কাল আবার একই সময়ে আসার অনুরোধ জানিয়ে বলে, আজ চলে যাও।
    বিজয় চলে আসে। কিন্তু আর যাওয়া হয়নি বেদেদের তাঁবুতে, দেখা হয়নি বাতাসের সাথে। কারণ, সেই রাতেই কী এক গণ্ডগোল বাঁধে তাঁবুতে; বাতাসের বাবা বাতাসসহ পরিবার নিয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যায় সেই রাতেই।

    বাতাসের স্মৃতি হিসেবে সেই জাদুর হাড়টি বিজয় সযত্নে আগলে রাখে। একসময় মিথুনের সাথে গড়ে ওঠে তার সম্পর্কের স্বপ্নজাল। বাতাস ক্রমশ মিলিয়ে যায় বিস্মৃতির অতলগর্ভ-অন্ধকারে। কিন্তু, একেবারে মিলিয়ে যায় না। মিথুনের মধ্যেই বিজয় কখনো কখনো বাতাসকেই দেখে, তাকেই খুঁজে নেয়। সময় এগিয়ে চলে। আর সে সময়-স্রোতের নানা আবর্তেই একসময় মিথুনের সাথে সম্পর্কও ক্রমশ নানা জটিলতায় আকীর্ণ হতে থাকে। তাদের সম্পর্কের সমাপ্তির কাহিনিটা যখন নিয়তি-নির্ধারিত পথেই এগিয়ে চলে তখন একদিন বিজয় ও মিথুনের দেখা হয়; শহরের উত্তরে এক বিপণিবিতানের কোণে দাঁড়িয়ে বিজয় মিথুনের হাতে একটি প্যাকেট এগিয়ে দেয়। মিথুন জানতে চায়, কী আছে এতে। বিজয় বলে, বাসায় নিয়ে দেখো। সেটাই ছিল মিথুনের কাছে দেওয়া বিজয়ের একমাত্র স্মৃতি, বাতাসেরও একমাত্র স্মৃতি, একটা জাদুর হাড়।

    বইয়ের একেবারে শেষ পাতায় এসে আবার আবির্ভাব ঘটে সেই ‘জাদুর হাড়’-এর, যা বিজয় আগেই সোনিয়ার চোখ এড়িয়ে গোপনে ফেলে দিয়েছিল গেস্ট হাউসের জানালার বাইরে। কীভাবে এই ফেলে দেওয়া জাদুর হাড় আবার ফিরে আসে, তা আমাদের জানা হয় না। তবে তা ফিরিয়ে দেন বিজয়ের মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রী। মাত্র তিনদিনের জ্বরে বিজয়ের স্ত্রী মৃত্যুকে বরণ করে নেন খুব স্বাভাবিকভাবে। আর এর পরই ঘটে অথবা কল্পনা করেন বিজয়, ‘তখন একটা সাদা ময়ুর কি ডেকে উঠল বিছানায়? বেরিয়ে গেল জানালা দিয়েই! সাদা আলোকচ্ছটায় বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আমার নিশ্বাস ঘন হয়ে আসছিল। ঘরের দরোজাটা খুলে দিলাম। দেখতে পেলাম আরও সাদা ময়ুর প্রবেশ করছে দরোজা দিয়ে। ঘরময় হল্লা করছে।’ এই ক’টি পঙক্তি দিয়েই শেষ হয়েছে উপন্যাসটি। এখানে সাদা ময়ুর কি প্রতীকী ব্যঞ্জনায় উপস্থাপিত এবং সাদা ময়ুরের আগমন ও ঘরে প্রবেশ করে হল্লা করা কি কিছুটা ইঙ্গিতবহ? স্মরণ করা যেতে পারে যে, এর মাত্র ক’দিন আগে ‘সাদা ময়ুর’ নামের লন্ডনের একটি পাবে বিজয় ও সোনিয়ার দেখা হয়েছিলো এবং সেদিন তাদের পরস্পরের সান্নিধ্য বেশ আবেগঘনও হয়ে উঠেছিলো। তখন পাবের দেয়ালে আঁকা সাদা ময়ুর জীবন্ত হয়ে উঠে একদৃষ্টে তাকিয়ে ছিল বিজয়ের দিকে।

    পড়াশেষে এক দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে বন্ধ করে রাখি বইটি। কিন্তু তারপর, ভালোলাগা এবং মুগ্ধতার এক স্বপ্নালু আবেশে আবিষ্ট থাকি আমি অন্তত আরও কয়েকটা দিন।

    একটা জাদুর হাড়/ জফির সেতু
    প্রকাশক: নাগরী, সিলেট
    প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
    পৃ. ১৪৪, মূল্য: ২৮০ টাকা।

এই সাইটে নিজম্ব নিউজ তৈরির পাশাপাশি বিভিন্ন নিউজ সাইট থেকে খবর সংগ্রহ করে সংশ্লিষ্ট সূত্রসহ প্রকাশ করে থাকি। তাই কোন খবর নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট নিউজ সাইটের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ রইলো।বিনা অনুমতিতে এই সাইটের সংবাদ, আলোকচিত্র অডিও ও ভিডিও ব্যবহার করা বেআইনি।